ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গোবিন্দ দেব দর্শন গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে দেব স্মারক বক্তৃতা ২০২৩ ও ২০২৪ আজ ১৪ অক্টোবর ২০২৬, বুধবার আরসি মজুমদার আর্টস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার।
অনুষ্ঠানে ‘সূফী দর্শনের সর্বজনীনতা’ শীর্ষক দেব স্মারক বক্তৃতা ২০২৩ প্রদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ্ কাওসার মুস্তাফা আবুলউলায়ী। ‘লেখাপড়া পড়াশোনা’ শীর্ষক দেব স্মারক বক্তৃতা ২০২৪ প্রদান করেন বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সিরাজ সালেকীন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন গোবিন্দ দেব দর্শন গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ও দর্শন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. নূরুজ্জামান। অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদ অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র দেবের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র দেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে ছিল যুক্তিনিষ্ঠ অনুসন্ধান, অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদর্শ। বিভিন্ন দার্শনিক ঐতিহ্যের মধ্যে সংলাপ প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের অস্তিত্ব ও মূল্যবোধের তাৎপর্য অনুসন্ধানে তাঁর আগ্রহ দর্শনের উদার ও মানবিক দিককে তুলে ধরে। দর্শন কেবল তাত্ত্বিক অনুশীলন নয়; বরং জীবন, সমাজ ও মানুষের অবস্থান সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করার একটি যুক্তিনির্ভর মাধ্যম।
উপাচার্য আরও বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি সত্ত্বেও বিশ্বে শান্তি, নিরাপত্তা ও নৈতিক মূল্যবোধের সংকট বিদ্যমান। ধর্মের অপব্যবহার যেমন মানবকল্যাণের পরিপন্থী, তেমনি নৈতিক দিকনির্দেশনা ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগও কাঙ্ক্ষিত কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না। তাই জ্ঞান ও বৈষয়িক সমৃদ্ধির পাশাপাশি নৈতিক উৎকর্ষ, মানবিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার বিকাশ অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র দেবের দর্শন আজও গভীর তাৎপর্য বহন করে।
দেব স্মারক বক্তৃতা দুটির বিষয়বস্তু ভিন্ন হলেও উভয়ের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট দার্শনিক যোগসূত্র রয়েছে উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, সূফী দর্শনের সর্বজনীনতা মানুষের আত্মিক উপলব্ধি ও নৈতিক উৎকর্ষের প্রশ্ন সামনে আনে। অন্যদিকে লেখাপড়া ও পড়াশোনা জ্ঞান অর্জন, পাঠাভ্যাস এবং মননশীলতার বিকাশের গুরুত্ব তুলে ধরে। একদিকে মানুষের অন্তর্জগতের বিকাশ, অন্যদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন ও উপলব্ধির পরিসর সম্প্রসারণ—উভয়ই মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও জীবনবোধকে গভীরতর করতে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা শুধু তার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক অর্জনের ওপর নির্ভর করে না; বরং জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণার উৎকর্ষ এবং স্বাধীন ও যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তার পরিবেশের মধ্য দিয়ে তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়। অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র দেবের জীবন, দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান নিয়ে গবেষণা, প্রকাশনা এবং নিয়মিত একাডেমিক আলোচনা অব্যাহত রাখার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, স্মারক বক্তৃতা কেবল কোনো মনীষীকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং তাঁর চিন্তা, আদর্শ ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং সমকালীন বাস্তবতায় তার তাৎপর্য অনুধাবনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র দেবের জীবন ও দর্শন দেশপ্রেম, মানবিকতা এবং যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বিকাশ ছোটবেলা থেকেই শুরু হওয়া জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান বিতরণ ও সৃষ্টির কেন্দ্র হিসেবে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সমাজে মানবিকতা, পরমতসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জোরদার করতে হলে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে। স্মারক বক্তৃতার আলোচনা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে বরং তা থেকে অর্জিত জ্ঞান ও উপলব্ধি ব্যক্তি ও সমাজজীবনে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে তিনি গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
১৪/১০/২০২৬
ফররুখ মাহমুদ
উপ পরিচালক
জনসংযোগ দফতর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।