ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেছেন, ইতিহাস বারবার সাক্ষ্য দেয় যে জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অস্বীকার করে এবং শাসনের নামে দমন-পীড়ন ও শোষণ চালিয়ে কোনো সরকার বা শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। জনগণের আকাক্সক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারকে অগ্রাহ্য করলে একসময় সেই শাসনব্যবস্থাকে ইতিহাসের কঠোর বিচারের মুখোমুখি হতেই হয়।
আজ ৩ আগস্ট ২০২৬, সোমবার দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। মূল আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুল আমিন বেপারী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াত, জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং জুলাই শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে শিক্ষার্থীরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে আহত, পঙ্গুত্ববরণকারী ও দৃষ্টিশক্তি হারানো আন্দোলনকারীদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
উপাচার্য বলেন, অহংকার ও ক্ষমতার অপব্যবহার কখনো স্থায়ী হয় না। বিশ্বের ইতিহাসে বহু স্বৈরশাসকের পতন ঘটেছে। জনগণের ওপর দমন-পীড়ন চালানো কোনো শাসনব্যবস্থাও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাও সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।
তিনি বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কিংবা পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন স্বৈরশাসনের পতনের মধ্য দিয়ে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে শাসনের নামে শোষণ, জনগণের মতামতকে অবজ্ঞা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করার পরিণতি কখনো শুভ হয় না।
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, নিজের দেশের জনগণের ওপর দমন-পীড়ন ও প্রাণহানি ঘটানো যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও কলঙ্কজনক। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর যে সহিংসতা সংঘটিত হয়েছিল, তা জাতির ইতিহাসে গভীর বেদনার অধ্যায় হয়ে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতায় থাকার অতি আকাক্সক্ষা, জনগণের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং নির্বাচনব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো কর্মকাণ্ড একটি রাষ্ট্রকে সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে জনগণের মতামত, ভিন্নমত এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিকল্প নেই।
উপাচার্য বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন কেবল একটি কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল না; সময়ের পরিক্রমায় তা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবিতে বৃহত্তর গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে নতুন প্রজন্ম দেশের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার নিয়ে গভীরভাবে সচেতন।
তিনি বলেন, শিক্ষকরা সবসময় শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষকদের প্রধান দায়িত্ব শ্রেণিকক্ষে জ্ঞানচর্চা হলেও জাতীয় সংকটের মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোও তাঁদের নৈতিক দায়িত্বের অংশ।
উপাচার্য বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই আন্দোলনের শিক্ষা ধারণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজ করতে হবে।

০৩/০৮/২০২৬
ফররুখ মাহমুদ
উপ পরিচালক
জনসংযোগ দফতর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।